Monday, August 21, 2023

মাতাল প্রেমিক

মাতাল হয়ে একদিন ঈশ্বরকে বলেছিলাম,
সুখ এনে দাও; আমি ভালোবাসা শিখে নিবো।
ঈশ্বর সুখ এনে দিয়েছিলো ঠিকই,
আমি ভালোবাসতে পারিনি তবুও।

চাঁদ-সূর্যের হিসেব কষতে কষতে যখন
মৃত্যুর দুয়ারে এসে জীবন ছেড়েছে হাল!
আমি দেখেছি-ভেবেছি; জেনেছি সর্বজ্ঞানে –
চাওয়াটাই ছিলো ভুল; এ জীবন নদীর পাড়।

আমি চাইনি প্রেম, খুঁজিনি হৃদয়;
জীবন গেলো স্বার্থের উপর।
ঈশ্বর তবু অপ্রেমিক নয়! —
বেসেছে ভালো, দিয়েছে হৃদয়।

প্রভুর সেই একতরফা প্রেমে,
আমি শুধু খুঁজিনি তাঁরেই।
খুঁজেছি সুখ, খুঁজেছি শান্তি; —
অথচ শান্তির ঠিকানা ‘ইসলাম’ জানি। 

Tuesday, August 8, 2023

Had a friend once, in a room

গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে এক কিউব আইস ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে এলিয়ে পরলো ইরিকা। বিছানায় পা ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে মনের সুখে তামাকের শেষ টানের ধোঁয়া ছাড়লো রবি। ধীরে ধীরে গ্লাসের সবটুকু হুইস্কি শেষ করে কম্পিউটারে "এনাদার নাইট টু ক্রাই" গান ছেড়ে চেয়ার ঘুরিয়ে রবির দিকে মুখ ঘুরালো ইরিকা। জানালার কাচে লেগে আছে ছিটকে আসা বৃষ্টির পানি, সেই পানি গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের পানির মতো গড়িয়ে পরছে। নেমে আসা সেই পানি থেকে চোখ সরিয়ে ইরিকার দিকে তাকালো রবি। বললো, "শুধু মানুষ নয়; এই শহর, এই গ্রাম, এই পৃথিবীও মনে হয় কাঁদে। সেই কান্নার জলে কেউ কেউ খুঁজে নেয় আনন্দ, আর যারা আনন্দ খুঁজতে জানে না- তাদের জন্য প্রকৃতির এই কান্না ভীষণ বিরক্তিকর।" একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুসফুস ভরে ধোঁয়া টেনে নিয়ে ইরিকা প্রশ্ন করলো, "যারা আনন্দ খুঁজে নিতে জানে, তাদের কাছে কি প্রকৃতির কান্না বিরক্তিকর হতে পারে না?"

কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলো আর জানালা ভেদ করে আসা চাঁদের আলোয় ঘরের অন্ধকার কেটে গেলেও, ঠিক আলোকিত ঘর বলা যায় না। তবু দুজন দেখতে পারছে দুজনের চোখ, মুখ, ঠোঁটের কম্পন। অলস দৃষ্টিতে ইরিকার দিকে তাকিয়ে আছে রবি। পলকবিহীন চোখে ইরিকা চেয়ে আছে রবির চোখে। যেনো মানুষ নয়, কোনো শিল্পীর তৈরী ভাষ্কর্যের চোখ দেখে বুঝার চেষ্টা করছে, শিল্পী এখানে কোন চরিত্রটি তুলে ধরতে চেয়েছেন। দুজনেই চুপচাপ, প্লে লিস্টের গান বদলে বাজতে শুরু করলো "হোয়েন এ ব্লাইন্ড ম্যান ক্রাইস"।

দুজনের নীরবতা কাটাতে রবি চোখ ঘুরিয়ে ইরিকার সমস্ত মুখ দেখে নিয়ে প্রশ্ন করলো, "কি দেখছো?"। প্রশ্নটা ইরিকার চোখ বা চোখের দৃষ্টি কোনোটাকেই নাড়া দিলো না। শুধু ঠোঁট নেড়ে মৃত মানুষের মতো উত্তর দিলো, "দেখছি না, ভাবছি। ভাবছি, মানুষের সাথে মানুষের শেষ দেখা কবে হয়েছিলো!"।


Friday, June 16, 2023

বাবাদের ঘরে ফেরা

সূর্যের শেষ আলোয় হাতঘড়িতে চোখ রেখে দেখি,
ঘণ্টা আর মিনিটের কাটা মুখ ঘুরিয়ে অভিমান করেছে।
পশ্চিম আকাশের শীতল লাল আলো,
কমিয়ে দিচ্ছে এই শহরের ক্লান্ত উত্তাপ।
অফিসের পাশে এই ছোট্ট টং-য়ে
রোজ এক কাপ চা হাতে নিয়ে ভাবতে থাকি,
আমার ছেলের জন্য আমি কতখানি বদলেছি।
দুই বছর আগে এই টং-য়ের সামনে দাঁড়ালেই,
আজিজ মামা একটা সিগারেট এগিয়ে দিতেন।
অফিস শেষে ঘরে ফিরে; মুহীবের গালে চুমো দিতে গেলে–
ওর মা ধমকাতো বলে ছেড়ে দিয়েছি।
অফিস শেষে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে
মুহীব ঘুমিয়ে যায় বলে; আড্ডা দেওয়া কমিয়েছি।
এইসব ভাবতে ভাবতে আমি অনুভব করি,
ছোট বেলায় এক ঝুম বৃষ্টির রাতে, কেন —
আমার বাবা বাড়ি ফিরেছিলো ঠিক ন’টা বাজার আগেই।

একদিন আমি বাবার জন্য ভাত নিয়ে গেলাম নদীর ওপার।
পাটের আঁটির উপর বসে বাবা আর আমি ভাত খাচ্ছিলাম।
সাদা ভাতের উপর সাজিয়ে রাখা পাটশাক,
সরিষার তেলে ভাজা কালো শুকনো মরিচ আর লবণের উপর—
খইয়ের মতো ফুটতে শুরু করলো বৃষ্টির তীক্ষ্ণ জল।
তার উপর ডাল ঢেলে দিতেই স্নিগ্ধ আনন্দে মন ভরে যায়।
পাটের আঁটিগুলো চালার মতো বেঁধে ভেলা বানিয়ে,
বৃষ্টির ভেতর নদী পার হচ্ছিলাম দুজন।
এখন আমি টের পাই, পাটের ভেলায় বসে–
লগিতে ধাক্কা দিতে দিতে; কেন আমার বাবা
আমার চোখে চেয়ে হুট করে হেসে উঠেছিলো।

প্রায় বৃহস্পতিবারের রাতে আমার,
ঘরে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত হয়ে যায়।
তবুও দেখি মুহীব ঘুমোয়নি।
আমার উপর অভিমান করে জেগে থাকে;
অথচ আমি যাওয়া মাত্রই গলা ঝড়িয়ে লাফিয়ে উঠে।
তারপর ওর মা'র ব্যস্ত কণ্ঠে শুনতে হয়—
সেই ঘুম জাগা অভিমানের ইতিহাস।
মুহীব ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আনমনে ভেসে উঠে,
আমার বাবা মায়ের প্রেমে আমি কেমন ফুল হয়ে জন্মেছিলাম।

ঘাম আর বৃষ্টির এক হয়ে যাওয়া বাবার সেই ধূসর শার্টে,
ঘন কালো দাগ ঢাকা পরতো কাদামাটির স্তরে স্তরে।
আমার বাবার গরীব হওয়ার দুঃখটা টের পাই তখন,
যখন মাসের শেষে মুহীবের অসুখ হয়।
ডাক্তারের লেখা প্রেসক্রিপশনের সবগুলো ঔষধ,
ফলমূল আর নানান রকম খেলনা কেনার পরেও
একজোড়া বেলিফুল আমি ঠিকই কিনতে পারি। 
নিজেকে কতটা গুছিয়ে নিয়েছি; তার একমাত্র সাক্ষী–
চার বছর আগে নতুন বউয়ের দেওয়া এই চামড়ার মানিব্যাগ।
বাবাদের বুঝি গুছিয়েই চলয়ে হয়;
যেভাবে গুছিয়ে চলে মায়ের রান্নাঘর।

গতবার যখন গ্রামে গিয়েছিলাম; আমার বাবা তখন–
মুহীবকে কোলে নিয়ে ডাক শিখাচ্ছিলেন “দা-দা দা-দা”।
বাবা রোজ সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময়,
মুহীবের জন্য কিছু না কিছু নিয়েই আসতেন।
একদিন মা ওর দাদার কাছে নিয়ে যাওয়ার ছলে
মুহীবের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখাচ্ছিলো।
আমি তখন সুখের ঘোরে খুব গোপনে
মুহীবের মায়ের চোখে চেয়ে নিঃশব্দে হেঁসে দিলাম।
সেই হাসি দেখলো না কেউ; জানলো না কেউ।

বাবা প্রায়ই শীতের সকালে প্রথম আলোয়,
মুহীবকে নিয়ে যেতো মসজিদের পাশের কবরস্থানে।
আগামী শীতে বাবা নিশ্চয় মুহীবকে
তার পূর্বপুরুষের কবর চেনাতে পারবে।
ততদিনে মুহীব কথা বলতে শিখে যাবে;
ইতিহাস তখন দাদা-নাতীর গল্প হয়ে যাবে।
কিংবা কেমন হবে! – যদি সেখানে,
গড়ে উঠে আরো একটি নতুন কবর?

এইসব ভাবতে ভাবতে চা ফুরিয়ে যায়।
আমি হাঁটতে থাকি; — একটুখানি আগে ঘরে ফিরতে
লোকাল বাস ছেড়ে সিএনজি’র দর কষাকষি করি।
পূর্ণিমার রাতে বেলি ফুলের মালা কিনতে গেলে,
মুহীবের জন্যও একটি কিনতে হয়; নয়তো–
হাসিমুখে ফুল তার মালিক বদলে ফেলে।
এমন একেকটি বেলিফুলের মালা কেনার জন্য,
আমি সারাটা বিকেল অবসাদ নিয়ে অপেক্ষা করতে পারি।
তারপর, তারপর আমার ঘরে ফেরা ক্লান্ত বুকে
লাফিয়ে উঠা ছেলের হাসিমুখ; আর সেই মুখে
উচ্চারিত সেই পুরোনো শব্দ “বাব-বা"—
আমার সকল অবসাদ নিমিষেই হারিয়ে যায়।
নিজেকে তখন বাবার মতো নায়ক মনে হয়।

Friday, April 28, 2023

ঘোরতত্ত্ব

হে পৃথিবী, তুমি কি আমার মতোই নিঃসঙ্গ?
হে চাঁদ, তুমি কি ঘরের বউয়ের মতোই বেশরম?
হে হাওয়া, তুমি কি পান্তা ভাতের ঝোলের মতোই হতভাগা?
হে আকাশ, তুমি কি পোষাকের মতোই ঘাতক?
হে জমিন, তুমি কি মজলুমের মতোই নির্বাক?
হে মানুষ, তুমি কি প্রেমিকের মতোই স্বার্থপর?
হে হৃদয়, তুমি কি অন্ধকারের মতোই সুন্দর?
হে প্রেম, তুমি কি গরীবের মতোই লোভী?
হে বিচ্ছেদ, তুমি কি নক্ষত্রের ধ্বংসের মতোই বিলীন?
হে মৃত্যু, তুমি কি পাখিদের জবান খুলে যাওয়ার মতোই ভয়ংকর?

Tuesday, April 11, 2023

জীবনতত্ত্ব

যে দুঃখকে আমি সুখ ভেবে প্রতারিত হয়েছি বারংবার,
সেই দুঃখকে ভালোবেসে সুখের করেছি অবহেলা।
যে সুখকে আমি দুঃখ জেনে কষ্ট পেয়েছি রোজ,
সেই সুখের অভিমানে দুঃখ আমার বারোমাস পাশে রয়।

যে পরকে আমি আপন ভেবে, আপনকে করি পর,
সেই পর কেউ আমার নয় কো দাদাই,
সেই পর কেউ আমার নয়।
যে আপনকে আমি পর ভেবে, পরকে করি আপন,
সেই আপনই আমার সব গো দাদাই,
সেই আপনই আমার সব।

যে প্রেমকে আমি ঘর ভেবেছি, সেই ঘর সত্য নয়।
যে প্রেমকে আমি ধ্বংস করেছি, সেই প্রেম মিথ্যে নয়।
ঘরে তবু প্রেম জাগে, আসল কিংবা নকল।
প্রেম বড় সহজ গো দাদাই, তবু কেন এতো কম?

Sunday, April 9, 2023

বিষণ্ণ সুন্দর রাত

যে কবিতা আমি লিখবো না বলে,
কসম কেটেছিলাম অভিমানের।
সেই কবিতা আজ বাতসের তালে হৃদয়ে বাজে।
যে দহনে নিকোটিনের জন্ম হয়ে উঠে স্বার্থক,
সেই দহনে উনুনের ক্ষয় কতটুকু জানো?
যে ধোঁয়া চোখকে পাশ কাটিয়ে নাচে আকাশের পরে,
সেই ধোঁয়ার আর্তনাদ কতটুকু জানো?
যে প্রেম দূরে সরে গেছে বলে দূরত্ব পারেনি মিলাতে,
সেই প্রেম কত কাছে ছিলো বলে,
দূরত্ব হয়ে উঠেছিলো জ্বরের উষ্ণতার মতো আপন?
ওগো শিমুলতুলোর মেয়ে, মনে পড়ে?
মনে পড়ে এইসব অপ্রেমের গল্প?
মনে পড়ে কোনো বৃষ্টিস্নাত রাতের শেষে?
কিংবা, ভয় পেয়ে জেগে উঠা কোনো মাঝরাতে ঘুমের পরে?

Sunday, March 19, 2023

আত্মপরিচয়

আমি পৃথিবীর প্রথম পুরুষের মতো হতাশ।
আমি পৃথিবীর শেষ পুরুষের মতো লোভী।
আমি বকুলের মতো হার মেনে যাওয়া কাপুরুষ।
আমি সূর্যমুখীর মতো যুদ্ধ করে যাওয়া মহাবীর।

আমি জীবনানন্দের সেই প্রেম,
"ছুটি লয়ে চ’লে যায় মন!"
আমি নজরুলের সেই বিদ্রোহী,
"জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!"

আমি ফ্রেডির মতো চিৎকার করে গেয়ে উঠি,
"Mama, I don't want to die,
I sometimes wish I'd never been born at all."
আমি পিংক ফ্লয়েডের সুরে কেঁদে উঠি,
"The child is grown, the dream is gone
I have become comfortably numb"
আমি জন লেননের মতো শান্তি চেয়ে বলি,
"Imagine there's no countries, it isn't hard to do
Nothing to kill or die for, and no religion too
Imagine all the people living life in peace"
আমি লালনের মতো গলা ছেড়ে গাই,
"কে বলে মানুষ মরে,
ও মানুষ মরলে পরে বিচার হবে কার গো?"

আমি নবজাতকের মতো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি,
আমি মৃত্যুর শিয়রে বসে হাহাকারে হয়ে যাই নির্বাক।
আমি ঝড়ের মতো আতঙ্ক এনে দিই নিজের বুকে,
আমি মৃদু বৃষ্টির মতো সুখের দমকা হাওয়া ছড়াই।
আমি যুদ্ধের ময়দানে জলন্ত বারুদের মতো হিংস্র,
আমি ফজরের আজানে জেগে উঠা এক ভীরু।

Friday, March 17, 2023

যেভাবে বেঁচে থাকি আমরা

আমাদের ভোর হয়, সূর্য ওঠে
আমরা জেগে উঠি, সতেজ হই।
চোখে জল দিই, স্নান করি।
আমরা বেরিয়ে পরি, দূরে যাই—
ইস্কুল, কলেজ, খেত, খামার, অফিস
দূরে, আরোও দূরে—
পৃথিবীর অন্ধকারে মিশে যাই সূর্যের যৌবনে।

আমরা ক্লান্ত হই, উদাস হই
গোধুলি রঙের অবসাদে শান্ত থাকি।
আমরা ব্যস্ত হই, ঘরে ফিরি
জীবনের সব ভুল হিসেবের ফাঁকে একটু হাসি।
আমরা ভালোবাসি, কথা বলি
রাতের অন্ধকারে সুখের আলো খুঁজি।

আমরা মূলত হতাশ, আমরা ব্যর্থ
নিজেদের বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বাণিজ্য নেই।
তারপর, নিজেদের বিক্রি করা টাকায় বাজার করি, তিন বেলা ভাত খাই।
কিংবা, মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। 

Thursday, March 9, 2023

দুঃখের হাস্যধ্বনি

এই ধুলো ধুলো শহর, ধুলোর মতো হৃদয়ে জমে থাকা সব ক্ষত, শহুরে মানুষ, প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা প্রাক্তন, জীবনের অবসাদে থমকে যাওয়া আমাদের সুখ, অবাক করে দিয়ে হেসে ওঠা আমাদের দুঃখ, কর্কশ হর্ণ বাজিয়ে যাওয়া ট্রাফিক জ্যাম, ব্যবহারযোগ্যবিহীন ফুটপাতে ছুটে চলা মানুষের ভীড়, সিগারেট ফুকতে থাকা বেকারের জীবন, হতাশার নদীতে ডুবে যাওয়া একটা মস্তিষ্ক, ক্ষুদার্ত পেট নিয়ে হেঁটে যাওয়া শূন্য মানিব্যাগ এবং পৃথিবীর সকল বিরহ আমাকে ভালোবেসেছিলো বহুবছর আগের কোনো এক চৈত্রের মধ্যদুপুরে। যেই দুপুরে আমি নিঃসঙ্গ কুকুরের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম কোন উদাস পাখির শুষ্ক চোখের কালোতে। 

বৈশাখের ঝড়ে কুড়িয়ে পাওয়া আমের হিসাব কষার মত জীবনের যে কয়টি বছর শিমুল ফুলের মতো ঝরে গেলো, অবসাদমাখা ক্লান্তিকর হতাশা ছাড়া কিবা উপহার দিয়েছি তাকে? শৈশবের শিলাবৃষ্টিতে কুড়িয়ে পাওয়া বরফের মতো কিছু সুখ জমিয়েছিলাম বুকপকেটে। দু’দণ্ড স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে টের পাই সুখের বরফ গলে ঝরছে আত্মঘৃণার জলপ্রপাত।

যে সুখের সাথে বনিবনা হয়নি আমার বাবার, সেই সুখকে খুন করেছি নিজ হাতে। যে শান্তির সাথে দেখা হয়নি আমার মায়ের, সেই শান্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছি বহুবার। যে দুঃখকে খুব আদরে পুষেছিলো আমার বাবা মা, সেই দুঃখ সয়ং আমি নিজেই। আয়নায় তাকালে সেই দুঃখ ভেসে উঠে বলে ভেঙে ফেলেছি সেই অন্ধকারের আয়না। আত্মার বেচাকেনা হয় না বলে আজও বাঁচিয়ে রেখেছি বাবা মার দুঃখকে। নিঃসন্দেহে আমি একজন সার্থক প্রতারক। যে কিনা নিজের মায়ের স্বপ্ন বিক্রি করে দিয়েছে কোনো এক তাসের ঘরে।

Monday, February 20, 2023

আধুনিক বাংলাচর্চা

“ডু ইউ নো, গেটিং দ্যা বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ উই হ্যাড টু পে অ্যা লট অফ ব্লাড এন্ড স্যাক্রিফাইজ?” 
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বয়ান ছাড়িয়া বাবুমশাই চুরুটে দিলেন টান।
গিন্নি তখন উদাস হইয়া কহেন “কস্ট অফ ব্লাড, কস্ট অফ ব্লাড”।

বাবুর ছেলে অনেক ছোট, স্যান্ডার্ড-থ্রিতে উঠিয়াছে মাত্র,
তবু বুঝিলো বিষয় মর্মান্ত, শিখিয়া নিলো দুটি শব্দ – “ল্যাঙ্গুয়েজ ডে”।
হেডফোন খুলিয়া মেয়ে বলে “আর ইউ টকিং এবাউট নাইনটিন ফিফটিটু?”

বাবুমশাই তখন গেলেন ক্ষ্যাপিয়া;
এতো বড় দামড়া মেয়ে, 
তবু জানে না ভাষা দিবস নিয়ে!
মেয়ে বলে “সরি পাপা, আই জাস্ট ফরগট অ্যা লিটল বিট”।

পরদিন – ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখ,
পরিবারের সবাই মিলিয়া, জুতোজুড়ো ঘরে রাখিয়া
একগুচ্ছ ফুল বাঁধাই করিয়া, ছুটিয়া চলিলো দলবল নিয়া।
বুলবুলিতে ফুল ফুটাইয়া, গাইছে তারা মিলিয়া-মিশিয়া
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী”।

Sunday, December 25, 2022

হিমুকরণ - ০১

অজ্ঞাতনামা একটা ছেলে ঢাকায় প্রবেশ করে। সে নিজেকে শুধু আড়াল করতে চায়। তাই নিজের মাঝে একটা অন্য মানুষ তৈরি করবে সে। অন্য মানুষ, অন্য নাম, অন্য অঙ্গভঙ্গি, অন্য সাজ, অন্য সবকিছু। আপাতত ঢাকায় একটা মেসে উঠে কোন এক নাম দিয়ে চালিয়ে দিছে। তারপর মেসে, মেসের-বাইরে মানুষজন পরিচিত হয়। এক সিগারেট দূরত্বে এক মেসে একজন বন্ধু ছিল উচ্চতর গাজাঁখুর, দিনে পাঁচ বেলা গাঁজা খাওয়া লোক।

একদিন অজ্ঞাতনামা যুবকটি উচ্চতর গাঁজাখুরের থেকে দুই টান উচ্চতর গাঁজা খেয়ে নিজের মেসে ফিরতেছিলো। মেসের সামনে এসে মনে হলো রাস্তায় হাঁটছে প্রচণ্ড ভালো লাগছে। পিছু ফিরে দোকান থেকে একটা চকলেট কিনে হাঁটতে লাগলো। চকলেট শেষ হলে পরপর দুই প্যাকেট চানাচুর খেতে খেতে আরও হাঁটতে লাগলো। এভাবে ঘোরের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে মেসের গেইট অফ করে দেওয়ার সময় হয়ে গেলো। সে আরও হাঁটতে লাগলো। অনেক হেঁটে মেসে ফিরে মেস মালিককে ডেকে গেইট খুলে বাসায় ডুকে। হেঁটে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে তার মনে হল হিমালয়ের মতো পর্বত বেয়ে উঠছে। সে ভাবছে এই হিমালয়টা পর্বতটাকে কেটে ছোটো করে ফেলা যায় কিনা। হঠাৎ মাথায় প্রশ্ন আসলো, হিমালয় কেটে ছোটো করে ফেললে কি হবে? সে নিজেই বলে উঠলো "হিমু"। এবং পরক্ষণেই খেয়াল করলো, হিমালয় থেকে হিমু; নিজেকে অন্য করে ফেলার ব্যাপার। ভালো লেগে গেলো। এবং নিজের অজ্ঞাতনামা ক্যারেক্টারকে একটা নাম দিলো, "হিমালয় হিমু"। যেই নামের ভেতর আছে নিজেকে বদলিয়ে ফেলার আহ্বান।

গাঁজা খেয়ে রাতে হাঁটার বিষয়টা হিমালয় সাহেবের চরম ভালো লেগে গেলো। ঘোরের মাঝে সবকিছু কেমন যেন অন্যরকম লাগে। তাই প্রায়ই গাঁজা খেয়ে মেসে ফিরতে দেরি করে। এজন্য মেস মালিক বা ম্যানেজাররা অনেক ঝামেলা করে। এবং কয়েক মাস পরপর মেস বদলাতে হয়। 

(আপাতত আর টাইপ করতে ইচ্ছা করতেছে না। হিমু আমারও খুব প্রিয় ক্যারেক্টার। কিন্তু একটা সুস্থ মানুষ কিভাবে এমন আজব কাজকাম করতে পারে এটা ভেবে ভেবে এতটুকু কল্পনা করলাম। "গাঁজা খাওয়া ছাড়া একটা মানুষ এমন অদ্ভুত হতে পারে", এই কথাটা আমার লজিককে হার মানাতে পারছে না। তাই আমার লজিকের দিকে মনোযোগ দিয়ে দৃশ্য আঁকল্যাম জাস্ট।)

Thursday, September 29, 2022

অথচ আমি মানুষ - দুই

আমি যদি মানুষ না হইতাম,
চৈত্রের দুপুরে উইড়া বেড়ানো শিমুলতুলার মতো
ভরদুপুরে তোমার বাড়ি যাইতাম।
অথচ আমি মানুষ,
তোমারে না পাওয়া দুপুরগুলাতে তোমার কাছে উইড়া যাইতে পারি না।

আমি যদি মানুষ না হইতাম,
চন্দ্রমল্লিকা ফুলের মতো ফুইটা থাকতাম তোমার বারান্দায়,
শেষ বিকেলের নিরবতায় আলতো করে ছুঁয়ে দিতে আমায়।
অথচ আমি মানুষ,
তোমার বারান্দায় আমার নামে বরাদ্দ কোনো জায়গা নাই।

আমি যদি মানুষ না হইতাম,
শরতের আকাশে সাদা সাদা মেঘ হয়ে কাশফুল এঁকে দিতাম,
তুমি আমাকে না পেয়ে ছুটে যেতে কাশফুলেদের কাছে।
"আমি নেই" এই একটা অনুভূতি ছুঁয়ে দিতো তোমায়।
অথচ আমি মানুষ,
চাইলেও তোমার হেঁটে চলা রাস্তার পাশে ঘাস হইতে পারি না।

Sunday, September 25, 2022

পরিত্যাক্ত মানব

ঘোরের ভেতর যে বাতাসের সংঘর্ষে শীতল হয়ে উঠেছিলাম,
সেই শীতলতার লোভে বাতাসের পিছু ছুটতে ছুটতে
নিজেকে আবিষ্কার করি নিজের থেকে অনেক দূরে।
বিভ্রান্তিকর এই অনিশ্চিত পথ থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়ে
নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি মাতাল শহরের কোনো পরিত্যাক্ত মদের বারে।
হারিয়ে যাওয়া নিজের অস্তিত্বের অভিশাপে—
এক বোতল হুইস্কি গোগ্রাসে খেয়ে ফেললো আমার শান্তিপূর্ণ হৃদয়।
ক্লান্ত শরীরে ভর করে আমার আহত আত্মা প্রবেশ করে প্রাণহীন শহরে।
যে শহরের পথ জানেনা তার শেষ ঠিকানা। সেই শহরে,
এক টুকরো শীতল বাতাসের খুঁজে আমি বিক্রি করলাম নিজের আত্মাকে।
 
এইসব শহুরে ভ্রান্ত অভিযোগ দূর হলে,
আমার শরীর ছুটে যাবে তোমার কাছে।
অবসাদমাখা আমার শরীর নতজানু হয়ে,
চেয়ে থাকবে তোমার শীতল চোখে।
তখন, তখন তোমার নরম হাতের স্পর্শে,
আমার শরীরে এনে দিও এক টুকরো হৃদয়।

Sunday, September 11, 2022

অসুখ হইলে আমার ইচ্ছা করে

অসুখ হইলে আমার ইচ্ছা করে, দরজা জানালা বন্ধ কইরা ঘরটারে আন্ধার বানাইয়া কাথা গায়ে দিয়া শুইয়া থাকি। শুইয়া শুইয়া জ্বরের সাথে মোলাকাত করতে করতে ঘোরের মধ্যে আমি মায়ের কোলটারে খুঁজতে থাকি। চিৎ হইয়া শুইয়া শুইয়া মনে করতে থাকি-, জ্বর হইলে যখন আমার  মায় মাথায় পানি ঢালতো; তখন একফোটা পানি হুট কইরা চোখের মধ্যে ডুইকা পরার অনুভূতিটা। ঘোরের মধ্যে আমি টের পাই আমার শরীরের লোমগুলো পরাজিত সৈনিকের মতো কাবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর আমি কাথাটারে আরো একটু আপন কইরা নিয়া গুটিশুটি হইয়া শুইয়া থাকি।

অসুখ হইলে আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে।
আমি ছুঁইটা যাই আমার কলমের কাছে,
কলম আমারে প্রত্যাখ্যান করে।
অসুখ হইলে আমার ছুঁইটা যাইতে ইচ্ছা করে,
ঘাসফুলে শিশির জইমা থাকা পুরানা রাস্তায়;
এইসব নাগরিক জীবন আমারে গলা পেঁচাইয়া ধরে।
অসুখ হইলে আমার ইচ্ছা করে,
ইচ্ছা করে আমি পাখি হইয়া যাই;
ছোটবেলায় নিজে হাতে মাইরা ফালানো
টুনটুনির বাচ্চার অভিশাপে আমার আর পাখি হওয়া হইলো না।

অসুখ হইলে আমার অনেক অনেক অনেক কিছু ইচ্ছা করে। এইসব এইসব ইচ্ছাগুলো যখন আমারে ঘাড় ধাক্কা দিয়া দূরে সরাইয়া দেয়। তখন আমি ধরতে চাইলাম একজোড়া শীতল হাত। যেই হাতের শীতলতায় আমার জ্বরের শরীরের সব উষ্ণতা মেঘ হইয়া উইড়া যাইবো। অথচ, অথচ সেই হাত দুইখানও আমার কখনো ধরা হইলো না।

Thursday, August 25, 2022

When a blind man cries

When a blind man cries,
Lord, only Lord knows
How much pain there is.

When a lost soul dies,
No one wants to know
Why someone is dying.

When a broken heart imagine,
He knows, only he knows
Nothing became the truth again.

Ahh life, only life, a struggle life knows
How many ways there are to be depressed.
Ohh love, only love, true love knows
How to burn life and soul carefully.

অন্ধের অন্ধকার

বিষাদ দিনযাপনের ইতিহাস থাকুক শহর জুড়ে। ঘর থেকে বের হলেই যেন দেখতে পাই, নষ্ট হওয়া খাবারের গন্ধে কতটা উন্মাদ দাঁড় কাক। ঘৃণাভরা কোলাহল ভাঙলেই য...