Saturday, April 23, 2022

শহুরে চিড়িয়া

ফুটপাত, সমান্তরাল ল্যামপোষ্ট,
পথিকের চোখ, খুঁজে নেওয়া আকাশ;
রং বদলে দেওয়া সোডিয়াম আলো।
শব্দের শরীরে মিশে থাকা, 
চলমান যান্ত্রিক কোলাহল, যানজট;
এবং ভীড়ের মাঝে একাকিত্বতা।
উঁচু নিচু দালানের জানালায়,
মাঝরাত্তিরের কান্না;
ঘুম কেড়ে নেয় চাঁদ;— আলোতে মিলায়।

এত এত রঙ, এত এত কোলাহল,
জানান দেয় এই শহর বেঁচে আছে।
তবু এ শহর বেঁচে থাকে !
বেঁচে থাকে এই শহরের চিড়িয়াদের
বিভ্রান্তিকর  হাসিমুখ, দ্বিতীয় মুখ।

Thursday, April 21, 2022

আত্নপ্রেম

নিজেকে এতোটা ভালোবাসি, এতোটা ভালোবাসি
যতটা ভালোবেসে কোনো বুলেট ছুটে যায় হৃদপিন্ডে।
নিজেকে এতো ঘৃণা করি, এতো ঘৃণা করি
যতটা ঘৃণা করলে নর্দমায় ফুটে উঠে একটি ফুল।

নিজের সাথে নিজের বনিবনা হয়নি বলে,
বারংবার গলা চেপে ধরেছি নিজের আত্মার।
শ্বাসবদ্ধ আত্মা তখন থুথু ফেলে আমার চোখে;
তখন আমার ঘোর কাটে। তারপর,
নিজের আত্মার গলা থেকে হাত নামিয়ে
থুথুমাখা চোখে ঝাপসা ঝাপসা দৃশ্য দেখি,
নিজের থেকে নিজে কতটা দূরে ছুটে গেছি।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আত্মা জিজ্ঞেস করে,
"ভালোবেসে কখনো জড়িয়ে ধরেছিস নিজেকে?"

অন্ধকারকে যতটা ভালোবাসি,
ততটা ভালো নিজেকে বাসতে পারিনি বলে,
সূর্যের সকল আলো আমাকে করেছে অবহেলা।
যে আলোর ভয়ে অন্ধকারের কুয়ো থেকে বের হইনি কোনোদিন,
সেই আলোর অভাবেই কখনো দেখতে পারিনি নিজেকে।

এইসব বিভ্রান্তময় ঘোরের দিন শেষ হলে,
বেঁচে থাকার সাহস নিয়ে অন্ধকারের কুয়ো থেকে বের হলাম একদিন।
তারপর আমি দেখতে পারি,
নিজেকে সুখী রাখার সবকটি গুপ্তমন্ত্র নিজের শরীরেই লেখা।

প্রেমহীন প্রেম

উদ্যানে প্রেম, প্রেমের সংশয়।
গাঢ়ত্ব হারায় প্রেমিকার ঠোটের রং
প্রেমিকার লজ্জামাখা চোখ,
প্রেমিকের বিলাসী চাহনি।
ভেসে যাওয়া শীতল হাওয়া বেখেয়াল ,
প্রেমিকার চুলের গন্ধ প্রকট।

শরীরের দেওয়াল ঘেষে জন্ম নেওয়া প্রেম,
তবু প্রেম বেঁচে থাকে মানবীর শরীরে।
এ প্রেম খুন হয় ক্যালেন্ডারে ক্যালেন্ডারে।
উচ্ছিষ্ট হয় গোলাপ, প্রেমিকার প্রেম,
অচেনা হয় প্রেমিক, অপচয় হয় প্রেম।

Saturday, April 16, 2022

বিধ্বস্ত মানব

 একটা শরীর, ব্যর্থতার ছায়াতে ডুবে থাকা কোন এক মানুষের শরীর। যার প্রতিটি লোমকোপে জ্বলছে আত্নঘৃণার আগুন। যে আগুনে পুড়ে শরীর হয়ে গেছে কঙ্কাল। যে কঙ্কাল বয়ে নিয়ে চলে শুধুমাত্র একটি প্রাণ। যে প্রাণ ভুলে গেছে ভালোবাসে, ভালোবাসা পাওয়ার অভাবে যে প্রাণ ভুলে গেছে ভালোবাসার স্বাদ। পুড়ে যাওয়া শরীরে শুধুমাত্র দুটি চোখ ছলছল করছে। যেমন ছলছল করে, ভোরের সকালে ঘাসের উপর জমে থাকা দুই ফোটা শিশিরকণা। যে চোখ চায়, এক জোড়া চোখের নির্মল দৃষ্টি। যে দৃষ্টিতে থাকবে না কোনো বিনিময়, থাকবে শুধুই ভালোবাসা।

ঘৃণার রঙ নিয়ে বেঁচে থাকা সেই কঙ্কাল ছুটে চলে মানুষের থেকে অনেক দূরে। যতদূরে গেলে কোনো প্রাণ চোখ মেলে দেখতে পারবে না তার শরীরের আর্তনাদ। যতদূরে গেলে ছড়াবে না তার পঁচে যাওয়া শরীরের বিষাদের ঘ্রাণ। নদিতীরের শীতল বাতাসের বেগের মতো ছুটে চলে সে শরীর। ছুটতে ছুটতে মিশে যায় সূর্যের অন্ধকারে। যেখানে সূর্যের অভিশাপে শুকিয়ে গিয়েছে চোখের নির্মলতা। অন্ধকারের আশির্বাদে শরীর পেয়েছে বিষাদের কালো রঙ।

তারপর বাতাসে শুকনো পাতার ওলটপালটের মতো করে হেঁটে চলছে কোনো উদ্দেশ্যবিহীন গন্তব্যে। সূর্যের মৃত্যুর পর সে পৌঁছে গেছে এক অভিশপ্ত লোকালয়ে। যেখানে মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র লক্ষ নিজেকে বৃক্ষ বানানো। যে বুলেটের আঘাতে নিহত হয়েছে নিজেদেরই পূর্বপুরুষ, সেই বুলেটের বারুদের গন্ধ তাদের বেঁচে থাকার উপকরণ। 

বিভ্রান্ত সব মানুষের সংস্পর্শে পুড়ে যাওয়া শরীরে জন্ম নিয়েছে নতুন ত্বক। যার প্রতিটি কোষের সংযোগস্থলে পরগাছা হয়ে জন্ম নিয়েছে হতাশা। তার পুড়ে যাওয়া শরীরের ছাই তাকে উপহার দিয়েছে আত্নঘৃণার পোষাক। মানুষ হয়ে যে শরীরের জন্ম হয়েছিলো, সেই শরীর এখন নিজেকে বৃক্ষ বানাতে ব্যস্ত। নিজেকে পুতে দেয়ার জন্য ব্যর্থতার কোদাল দিয়ে খনন করে চলছে সময়ের ভূমি। নিজেকে বৃক্ষে পরিণত করাটাই এখন তার একমাত্র লক্ষ। যে লক্ষ তাকে নির্ধারণ করে দিয়েছে এই অভিশপ্ত মানবসভ্যতা। 

বিষাদময় এই শরীর তবুও স্বপ্ন দেখে। তবু স্বপ্ন দেখে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার। ইচ্ছে করে ব্যর্থতার কোদালকে পুড়িয়ে দিয়ে অভিশপ্ত লোকালয় থেকে অনেক দূরে চলে যেতে। যতদূর চলে গেলে কেউ জানতে পারবে না তার আর্তনাদের গল্প। যতদূর ছুটে গেলে সে খুঁজে পাবে নির্মল চোখ, অভিনয়হীনতা। যেখানে সে খুঁজে পাবে নির্মল দৃষ্টি, ভালোবাসা। যেখানে মানুষজনের লক্ষ নিজেকে বৃক্ষ বানানো নয়; বরং জীবনকে সহজ করা। যতটা সহজ করলে কেউ তার নিজের সাথে নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। যে লোকালয় স্বপ্নভঙ্গের অপরাধে সুখকে হত্যা করে না। বরং, বিচ্ছেদের আশির্বাদে ভালোবাসার চাষাবাদ করে।

যে প্রেম আমি চাই

একটা ঘর বানাতে চাই, যেখানে-
অদূরে থাকবে স্বচ্ছনদী,
কিনারা ঘেঁষে বালির চিকচিক;
কাশফুলের সাদা রঙের দোল,
দূর্বাঘাসে ছেয়ে যাবে মরুভূমি।

একটা মানুষের সঙ্গ চাই, যে-
পড়ন্ত বিকেলের ঠাণ্ডাবাতাসে
নীল শাড়ি নীল চুড়ি পড়ে
সুরেলা বাতাসে আবেগ উড়াবে।
ঘনিয়ে আসা আধারে কালো চুল উড়াবে,
ঐপাশের সাদা কাশফুল তার সঙ্গ দিবে।

একজোড়া চোখ চাই, যেখানে-
আমার নির্ঘুম চোখ ভুলে যাবে আমাবস্যা,
সঙ্গ দিবে আমার চন্দ্রবিলাসীতার।
বুঝে নিবে সকল ভাষার দায়ভার;
মলিন থাকবে আমার অপেক্ষায়,
অশ্রু ঝরবে আমার ভালবাসায়।

Sunday, April 10, 2022

মৃত্যু যতদূর- ততদূর উদাসীনতা

 ধরেন আপনি জেনে গেছেন আপনার জীবনে কতটুকু সময় বাকি আছে। ধরে নেন সেই সময় মাত্র এক ঘন্টা। ঠিক এক ঘন্টা পরে আপনার মৃত্যু। তাহলে আপনি কি করতেন? পরিবার এবং প্রিয় মানুষকে সময় দিতেন? কিংবা একদিন বা ২৪ ঘন্টা সময় আছে। তাহলে কি করতেন? আগের করণীয়তার সাথে তওবা করতেন? নিজের পাপ কাজের জন্য কান্নাকাটি করতেন? যদি এক সপ্তাহ থাকতো? তাহলে তার সাথে আর কি কি করতেন? যাদের কাছে নিজেকে দোষী মনে হয়  তাদের কাছে ক্ষমা চাইতেন? কিংবা আর্থিক ঋণমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতেন? যদি এক মাস সময় পেতেন? আপন মানুষদের একটু বেশি খুশি রাখার চেষ্টা করতেন? 

এমন যদি হতো আপনাকে সেই নির্দিষ্ট সময় বলে দেওয়া হলো, এবং সেই সময় পঞ্চাশ বছর। তাহলে? তাহলে কিচ্ছু করতেন না। প্রথম উনপঞ্চাশ বছর একদম বেখেয়ালী জীবনযাপন করতেন। শেষের এক বছরে সেই এক্টিভিটিজ। আসলে আমরা সময়সীমা জেনে গেলেই সাবধান হই। শুধুমাত্র তখনই নিজেকে গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পরি। কিন্তু জীবন তো আমাদের সময়সীমা জানায় না। জীবন চলে লিনিয়ার গতিতে। যখনই তার শেষ সীমানা খুঁজে পায়, তখনই শেষ হয়ে যায়। মূলত জীবন নিজেও জানে না তার সীমানা কতদূর।

আমরা ধরেই নিই যে, আমরা নাতি নাতনীর যৌবন দেখে মারা যাবো। সেই হিসেব করেই তো সুদূর প্রসারী চিন্তা করি, পরিকল্পনা করি, বাস্তবায়ন করি। জীবন হইলো বেলুনের মতো। যেকোনো সময় ঠাস কইরা ফুইটা যাইতে পারে, যাইতেই পারে। কিংবা জীবন একটি সুন্দর ফুলের মতো, কলি থেকে ফুলের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য ভেদ করে একসময় শুকিয়ে ঝরে পরবে, ঝরে পরবেই। এইযে জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, এইটা কিন্তু নিশ্চিত। গণিতের ভাষায় সম্ভাবনা এক বা সম্পূর্ণ। এইটা আমরা সবাই জানি, বিশ্বাস করি। কিন্তু অনুভব করি না। অনুভব করতে না পারাতে কি হচ্ছে? বিশ্বাসটা শুধু বাহ্যিক রূপে দাঁড়িয়ে আছে, ভাষ্কর্যের মতো। ভাষ্কর্যে শরীর থাকে, প্রাণ থাকে না।

Tuesday, March 29, 2022

বৈশাখী ঝড়

 বাইশে বৈশাখ। মাত্রই বিকেলের শুরু। গাঢ় অন্ধকার। কালো মেঘেরা নিষ্প্রাণহীনতায় উড়ছে। একদল পাখি যেনো বাসাতের বেগে উড়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। ঘুড়ি প্রিয় কিশোরদলও নাটাই হাতে দৌড়ায়। ছোট ছোট উলঙ্গ শিশুরাও হা করা বড় মুখ নিয়ে ছোট চোখে তাকিয়ে থাকে হাসিবিহীন ছেলেমানুষি আনন্দে। বেগ বাড়ছে ঘূর্ণিবাতাসের। মায়ের বকুনি শোনার আগে বাড়ি ফেরার তাড়া শিশুকিশোরের। একপাল গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার তাড়া মধ্যবয়সী লোকটির। তের বছর বয়সী ছেলেটাও ছাগলের খুঁজে অক্লান্ত।

নদীর ঢেউ যেনো ঝড়ের ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে উঠছে জলকণা। প্রবল বাতাসে নদীর ওপারের কলাগাছের ঝোপটাও বাতাসের তালে নৃত্যরত। বাড়ীর পাশে সারি সারি সুপারি গাছ ঝড়ো বাতাসে বিদ্রোহী পতাকার মত উড়ছে। বাঁশবাগানের এলোমেলো ছোটাছুটিতে কিছু বাঁশপাতা বাড়ীর উপর দিয়ে এসে বাতাসে উড়ছে। সাদাকালো আকাশ, ঘোলাটে দূরদৃষ্টি, অন্ধকার নেমে এসেছে আকাশে, বৃষ্টি নেই, ধূলিময় বাতাস, এই বুঝি ঝড় এলো।

ঝড়োয়া বাতাসে ধূলি ধূসরিত রাস্তায় শক্তি বেড়েছে বৃদ্ধার হাতের লাঠির। বাড়ির সামনে বাচ্চাদের ছোটাছুটির সাথে তাল মেলাতে বাদ দেয়নি তিনটি বাছুর আর ছাগলের চার বাচ্চা। বাড়ীর মেঝো বউটির চোখে ঠোটে দেড় বছরের বাচ্চাকে আগলে রাখবার আনন্দ।

অদূরে মফস্বল। মেয়েদের স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। সাদা পাজামা আর সাদা স্কার্ফ এর মাঝে সবুজ জামা পরা স্কুল বালিকারা বিচ্ছিন্নভাবে দলবেঁধে স্বগণ্ডগোলে হেঁটে যায়। তাহাদের হাসিমুখে চিকন গলার স্বর প্রবল বাতাসকে অগ্রাহ্য করে। দলবাঁধা কিশোরীর আচমকা হাসির শব্দ ঝড়োয়া বাতাসকে হার মানায়, প্রকৃতিকে উন্মাদ করে তুলে । তবুও তাহাদের পায়ে বাড়ী ফেরার তাড়া, দ্রুততা । গোলাপি ঠোটের কম্পনে সাদা দাঁত আর জিহ্বার লাল পৃষ্ট সাদাকালো আকাশের পূর্ণতা। হাসিমাখা ফোলা গাল প্রত্যুত্তর দিয়ে যায় বান্ধবীর হাসির। তবুও কেয়ার হাসিমুখে ভয়ার্ত চোখে সন্ধানী দৃষ্টি। অপেক্ষারত হৃদয় জানে নিখোঁজ সংবাদ। কি যেনো নেই, কে যেনো নেই! সাজিদ কই?

পৃথিবীর আর্তনাদ

 মধ্যরাত। আধার আকাশে অজস্র তারা। শব্দহীন আকাশ, কোলাহলবিহীন চারিপাশ। নিয়ন আলোর ল্যাম্পপোস্ট, হিলিয়াম আলোয় রাতের শহরে আলোকিত জানালার মানবহীনতার আর্তনাদ ছেয়ে গেছে যান্ত্রিক শহর, যাপিত জীবন। কংক্রিটের দেয়ালে আলো আধারের এই আর্তনাদ কারো চোখের পিউপিল ভেদ করে মগজে ভাসায় সূর্যের এলগরিদম ; হাহাকার বুকে কান্না আসে দীর্ঘশ্বাসের ।

স্থির চোখে খোলা ছাদে দোলনায় দোল খেয়ে আমি শাহীদ আকাশের তারা দেখি, তারাদের সাথে কথা বলি, আত্নকথোপকথন ! মাঝরাতে এক শহর আধারের তন্দ্রা নেমে আসে আমার চোখে ; অক্লান্ত শরীর ছুঁয়ে যায় এক মেঘ শীতলতা। কনজাংটিভা আবৃত হয় চোখের পাতায়। দূরদৃষ্টি থেমে যায়। আমার চোখ দেখে আমাকে। নিথর শরীর দোলতে থাকে খোলা আকাশের নিচে।

আমার অবচেতন মনকে ভর করে আমি উপরে উঠছি। দেখছি, খোলা ছাদের এককোণে পাতা দোলনাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন শাহীদ দোলছে। যেনো এই শহরের সুখ তার খাদেম। সকল সুখেরা তার চোখে ভর করে আছে, জেগে আছে শিয়রে । রাতের নিরব আধারের বাতাস তার ঘুমন্ত শহরের ঘড়ির কাটা থামিয়ে দিয়েছে, ভুলাচ্ছে তার জগত।

আমি আরো উপরে উঠছি। দেখছি পুরো একটা শহর। উঁচুনিচু দালান , রাজপথে যানজট, আলোর কোলাহল, যান্ত্রিক মানব । তারার মত জেগে আছে শহরের আলো ; যেনো শহরজুড়ে একটুখানি লোডশেডিং এর আবদার। ইটের পাহাড়ে আলোকিত জানালার ভেতরের চিড়িয়া নির্ঘুম। সাদাকালো চোখে মিথ্যের রঙ। গলা থেমে গেছে আজ প্রযুক্তির আশীর্বাদে ; হলুদ রঙা মুখোশ সাজাচ্ছে মিথ্যে অনুভূতি, কিবোর্ডে জন্ম নিচ্ছে নাগরিক হাসি। মনে জমানো আছে আগুনের খনি, আবেগ পোড়াচ্ছে। উন্মাদী ভালবাসা হারিয়ে যাচ্ছে । এই শহরে প্রেম আছে, ভালবাসা নেই । হ্যাঁ প্রেম! শরীরকেন্দ্রিক প্রেম। ইভান ভাইয়ের গানের কথায়, "নেশা লাগে ঠোটে, নিশানা চোখে" ।

আমি আরো উপরে উঠতে উঠতে একদম পৃথিবীর বাইরে চলে এসেছি। আমি মহাশূন্য থেকে পৃথিবী দেখছি। দেখছি নাগরিক মানুষের যান্ত্রিক সংসার। সূর্য উঠে সূর্য ডুবে, ঘড়ির কাটা ১২-৬-১২ খেলা করে, আলো আঁধারের রঙ জ্বলে নিভে। এই পৃথিবীতে আবেগের চেয়ে অর্থের দাম বেশী ; ভালবাসার চেয়ে বিলাসিতার দাম বেশী।

আমি এতো উঁচু থেকেও স্পষ্ট শুনতে পারছি পৃথিবীর আর্তনাদ। চিৎকার করে আমি পৃথিবীকে বলছি , " পৃথিবী, কেমন আছো ? কেমন আছে তোমার মানব চিড়িয়ারা? "

অপ্রেমিক হয়ে উঠা

বয়স যখন অনুর্ধ আঠারো
তখন আমার প্রেম ছিল না,
তবু আমি প্রেমিক ছিলাম।
এখন আর প্রেমিক হতে পারি না।

কৈশোরে চোখের যে লজ্জা ভয় হয়ে যেতো,
তারুণ্যে সেই লজ্জা বানাতো দুঃসাহসী।
কৈশোর তারুণ্যে ছিল প্রেমিকের চোখ,
যৌবনে মৃত আবেগ, প্রেমিকা সর্বনাশী।

প্রেমিক থেকে অপ্রেমিক হওয়া মানুষের,
বাহ্যিক কান্না আসে না। 
ভালোবাসতে ভুলে যাওয়া মানুষ,
নিজেকে খুঁজে পায় না।

উপহার

 মানুষ মানুষকে কবিতার বই উপহার দেয়, গল্প-উপন্যাসের বই উপহার দেয়। কিন্তু কেউ কবিতা বা গল্প-উপন্যাস উপহার দেয় না। কারণ কবিতা, গল্প, উপন্যাস এইসবের বাহ্যিক কোনো গঠন নেই। সকল উপহার মানুষ বস্তুগত রূপে দিতে চায়। অথচ আমাদের জীবনে অন্যদের থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় উপহারগুলোরই কোনো বাহ্যিক রূপ নেই। যেমন, মায়ের কোলে তার শিশুর প্রতি ভালোবাসা, শৈশবের বন্ধুত্ব, স্কুল টিচারের ধমক কিংবা বেতের বারি, প্রেমিকার সাথে কাটানো মুহুর্ত, ভালোবাসা নিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার দুই জোড়া চোখের কথোপকথোনও উপহার; খুব সুন্দর উপহার। কারণ আমরা সময়ের পরে এইসবই মনে রাখি। অথচ উপহার হিসেবে শুধু বস্তুগত বিষয়ই খুঁজি। একটি পছন্দের গানও হতে পারে একটি উপহার। যেমন উপহার দিয়েছিলো আমার প্রাক্তন প্রেমিকা আমাকে। সেই গান যেনো তার নামে রেজিস্ট্রি করে রাখা আছে। এবং এই উপহার হারানোর সকল সম্ভবনা হারিয়ে গেছে। সেই গান শুনবো আর তার কথা আমার মনে পড়বে না; এমন কখনো হতে পারে না। এর চেয়ে সুন্দর উপহার আর কি-বা হতে পারে!

তাত্ত্বিক প্রেমিক

আমার একজন তাত্ত্বিক প্রেমিকা প্রয়োজন।
যে প্রেম নয়, প্রেমতত্ত্ব নিয়ে আসবে।
যার সাথে কথা হবে কবিতায় কিংবা চোখে
চুমু হবে কথাদের ঘর্ষণে, যুক্তির ওলট-পালটে
মন চাইলে কাছে আসবে দিনে একশোবার
কিংবা দূরে থাকবে একশো বছর,
তারপর হঠাৎ একদিন মন চাইলেই,
হুট করে এসে বলবে "ভালবাসি"
এ নিয়ে কারো কোনো অভিমান থাকবে না। 

আত্ন-অপ্রকাশ

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রজাপতি যদি জানতো,
সে বিশ্বের সমগ্র সৌন্দর্যকে ধারণ করে।
তাহলে নিজেকে লুকিয়ে রাখার অপরাধে,
অন্ধকারে বিসর্জন দিতো উড়ে বেড়ানোর আনন্দকে।
অথচ সে নিজের সৌন্দর্যকে জানে না বলেই,
সৌন্দর্যের লোভে ঘুরেফিরে অসুন্দরেও আনন্দে হাসে।

পৃথিবীর প্রতিটা মুহুর্ত নতুন করে জন্ম নেয়।
পৃথিবীর প্রতিটা হাসি নতুন করে জন্ম নেয়।
পৃথিবীর প্রতিটা প্রেম নতুন করে জন্ম নেয়।
নতুন করে জন্মায় না শুধু মানুষ, তবু
নতুন করে জন্ম নেয় মানুষের সবকিছু;
নতুন করে জন্ম নেয়, তোমার আমার--
ঠোঁটের কোণের হাসি, চোখের মিথ্যে পানি,
আমাদের যত ভুল ভালোবাসাবাসি,
প্রেমের মুখোশ পরে অপ্রেমের অনুভূতি।
গভীর অন্ধকারে পৃথিবীর চুম্বনে বুঝেছি,
নিজেরাই তো নিজেদের খুনী।

আমি বলি এইসব ভুলে চলো, একটুখানি বাঁচি
যেমন করে বেঁচে থাকে,
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রজাপতি।
যেমন করে বেঁচে থাকে,
সদ্য জন্মানো ছোট্ট শিশুটি। 

আমাদের চোখ

 পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ আছে, ঠিক তার দিগুণ আছে মানুষের চোখ। আর তাই আমরা দৃশ্যের ভিতর দেখি মিথ্যের ছায়া, আর মানুষের ভিতর রোবট। পৃথিবীর ইতিহাসে আজীবন দৃশ্যমান বিষ্ময়কর হয়ে থাকবে এই মানুষের চোখ। কখনো আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠে আমাদের চোখ, কখনও কালো মেঘ। কখনওবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো চলতে থাকে জীবনের অনিশ্চিত সব হিসেব, কিংবা যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত শহরের মতো হতাশার ক্লান্তি নিয়ে থমকে যায় আমাদের চোখ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিরিয়াল কিলারের চোখেও ভেসে উঠে প্রেমের চিহ্ন। কিংবা নিজের মাকে হত্যা করার পূর্ব মুহূর্তে যে চোখ ছিলো আগুনের মতো উত্তাপ, রক্তের মতো লাল; মাকে হত্যার করার পর সে চোখে নামে বৃষ্টি, নির্মল গ্রামের শেষ রাতের বৃষ্টি। কিংবা পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতু প্রেমিকা, "লোকে জানবে" এই ভয়ে যার প্রেমটি এখনো হয়ে উঠেনি, যার চোখ সদ্য ফুটে উঠা ফুলের মতো লাজুক; সেই চোখও হয়ে যেতে পারে মরুভূমির মতো শুষ্ক।

আমাদের দৃশ্যমান চোখেরই যখন এতো রূপ। তখন, যে চোখ অদৃশ্য কিংবা যে চোখে ভর করে একজন অন্ধ মানুষ হেঁটে চলে; সেই চোখের না জানি কতরূপ! সেই চোখ যদি দেখা যেতো, তাহলে হয়তো আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম। মুগ্ধ হয়ে ভালোবেসে যেতাম একে অপরকে। কিংবা, আজীবন দূরে থাকতাম একে অপর থেকে। ভাগ্যিস আমাদের চোখ কারো অদৃশ্য চোখকে দেখতে পারে না।

বোবা প্রেমিক

তুমি উত্তাল চলমান নীরব স্রোতের এক চিরযৌবনা বহমান নদী। যে নদীতে সমুদ্রজয়ী প্রেম বিজয়ী নাবিকের নিষেধাজ্ঞা জারী। আমি তাই গাঙচিল হয়ে উড়ে যাই তোমার বক্ষরেখা বেয়ে। হঠাৎ দেখলাম একটা মাছরাঙা এসে তোমার শরীর ছুঁয়ে নিয়ে গেলো একটি প্রাণ, আমি কিচ্ছু বলিনি। এরপর দেখলাম, একগুচ্ছ কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে তোমার শরীর ছুঁয়ে, আমি কিচ্ছু বলিনি। তারপর দেখলাম, একটি কিশোরের দল লাফাচ্ছে তোমার শরীরে, আমি কিচ্ছু বলিনি। শেষমেশ যখন আমি উড়তে উড়তে ক্লান্ত ভীষণ, তখন দেখলাম তোমার সত্ত্বা মিশে যাচ্ছে সমুদ্রে। আমি কিচ্ছু বলিনি। শুধু তোমার থেকে চোখ সরিয়ে দেখি, আমি তোমার বক্ষ বেয়ে আসলেও আমার ছায়া ছিল শুষ্ক মাঠের কিনারা ঘেষে। আমি হতাশ হইনি। শুধু, শুধু সাগরের মাঝে তোমারে খুঁজতে গিয়ে– আমি তোমারে পাইনি।

পরিচয় বদল

ধরো, ত্রিশ বৎসর পর হঠাৎ একদিন
'পৃথিবীটা গোল' থিওরিতে আমাদের আবার দেখা হয়ে গেলো,
ততদিনে আমাদের বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
আমার হাতের স্পর্শে তোমার যে শরীর এখন চঞ্চল হয়ে উঠে
তখন সে শরীর থুবড়ে যাবে বয়সের স্পর্শে। 
আমার ঠোঁটের স্পর্শে তোমার যে ঠোঁট আরো রক্তিম হয়ে যায়
তখন সে ঠোঁট রক্তজবার মতো লাল হবে সবুজ পানপাতায়।
এইযে এখন তুমি আমার যে হাতটি শক্ত করে ধরে আছো
ততদিনে এই হাত শক্ত করে ধরতে শিখে যাবে বুড়োদের লাঠি।
আজকাল যে ঘন কালো চুলে তুমি হাত বুলিয়ে দাও
ততদিনে এই চুল বকের ডানার মত সাদা হয়ে যাবে।

তখন আমায় চিনতে পারবে?
তোমার আজকের এই প্রেমিককে?
চিনতে পারবে আমার এই চোখ?
যেখানে তুমি তোমার সমুদ্দুর খুঁজে পাও
নাকি, ততদিনে আমাদের চোখে বসবাস করা
মোটা গ্লাসের চশমার অজুহাত দিবে?
সেদিন তোমার মনে পড়বে? আমাদের শেষ চুমুর কথা?
মনে পড়বে? শেষ কবে আমার জন্য কেঁদেছিলে?
নাকি ভুলে যাবে কি আমার নাম? কে আমি ছিলাম?

অন্ধের অন্ধকার

বিষাদ দিনযাপনের ইতিহাস থাকুক শহর জুড়ে। ঘর থেকে বের হলেই যেন দেখতে পাই, নষ্ট হওয়া খাবারের গন্ধে কতটা উন্মাদ দাঁড় কাক। ঘৃণাভরা কোলাহল ভাঙলেই য...