Tuesday, March 29, 2022

বৈশাখী ঝড়

 বাইশে বৈশাখ। মাত্রই বিকেলের শুরু। গাঢ় অন্ধকার। কালো মেঘেরা নিষ্প্রাণহীনতায় উড়ছে। একদল পাখি যেনো বাসাতের বেগে উড়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। ঘুড়ি প্রিয় কিশোরদলও নাটাই হাতে দৌড়ায়। ছোট ছোট উলঙ্গ শিশুরাও হা করা বড় মুখ নিয়ে ছোট চোখে তাকিয়ে থাকে হাসিবিহীন ছেলেমানুষি আনন্দে। বেগ বাড়ছে ঘূর্ণিবাতাসের। মায়ের বকুনি শোনার আগে বাড়ি ফেরার তাড়া শিশুকিশোরের। একপাল গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার তাড়া মধ্যবয়সী লোকটির। তের বছর বয়সী ছেলেটাও ছাগলের খুঁজে অক্লান্ত।

নদীর ঢেউ যেনো ঝড়ের ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে উঠছে জলকণা। প্রবল বাতাসে নদীর ওপারের কলাগাছের ঝোপটাও বাতাসের তালে নৃত্যরত। বাড়ীর পাশে সারি সারি সুপারি গাছ ঝড়ো বাতাসে বিদ্রোহী পতাকার মত উড়ছে। বাঁশবাগানের এলোমেলো ছোটাছুটিতে কিছু বাঁশপাতা বাড়ীর উপর দিয়ে এসে বাতাসে উড়ছে। সাদাকালো আকাশ, ঘোলাটে দূরদৃষ্টি, অন্ধকার নেমে এসেছে আকাশে, বৃষ্টি নেই, ধূলিময় বাতাস, এই বুঝি ঝড় এলো।

ঝড়োয়া বাতাসে ধূলি ধূসরিত রাস্তায় শক্তি বেড়েছে বৃদ্ধার হাতের লাঠির। বাড়ির সামনে বাচ্চাদের ছোটাছুটির সাথে তাল মেলাতে বাদ দেয়নি তিনটি বাছুর আর ছাগলের চার বাচ্চা। বাড়ীর মেঝো বউটির চোখে ঠোটে দেড় বছরের বাচ্চাকে আগলে রাখবার আনন্দ।

অদূরে মফস্বল। মেয়েদের স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। সাদা পাজামা আর সাদা স্কার্ফ এর মাঝে সবুজ জামা পরা স্কুল বালিকারা বিচ্ছিন্নভাবে দলবেঁধে স্বগণ্ডগোলে হেঁটে যায়। তাহাদের হাসিমুখে চিকন গলার স্বর প্রবল বাতাসকে অগ্রাহ্য করে। দলবাঁধা কিশোরীর আচমকা হাসির শব্দ ঝড়োয়া বাতাসকে হার মানায়, প্রকৃতিকে উন্মাদ করে তুলে । তবুও তাহাদের পায়ে বাড়ী ফেরার তাড়া, দ্রুততা । গোলাপি ঠোটের কম্পনে সাদা দাঁত আর জিহ্বার লাল পৃষ্ট সাদাকালো আকাশের পূর্ণতা। হাসিমাখা ফোলা গাল প্রত্যুত্তর দিয়ে যায় বান্ধবীর হাসির। তবুও কেয়ার হাসিমুখে ভয়ার্ত চোখে সন্ধানী দৃষ্টি। অপেক্ষারত হৃদয় জানে নিখোঁজ সংবাদ। কি যেনো নেই, কে যেনো নেই! সাজিদ কই?

পৃথিবীর আর্তনাদ

 মধ্যরাত। আধার আকাশে অজস্র তারা। শব্দহীন আকাশ, কোলাহলবিহীন চারিপাশ। নিয়ন আলোর ল্যাম্পপোস্ট, হিলিয়াম আলোয় রাতের শহরে আলোকিত জানালার মানবহীনতার আর্তনাদ ছেয়ে গেছে যান্ত্রিক শহর, যাপিত জীবন। কংক্রিটের দেয়ালে আলো আধারের এই আর্তনাদ কারো চোখের পিউপিল ভেদ করে মগজে ভাসায় সূর্যের এলগরিদম ; হাহাকার বুকে কান্না আসে দীর্ঘশ্বাসের ।

স্থির চোখে খোলা ছাদে দোলনায় দোল খেয়ে আমি শাহীদ আকাশের তারা দেখি, তারাদের সাথে কথা বলি, আত্নকথোপকথন ! মাঝরাতে এক শহর আধারের তন্দ্রা নেমে আসে আমার চোখে ; অক্লান্ত শরীর ছুঁয়ে যায় এক মেঘ শীতলতা। কনজাংটিভা আবৃত হয় চোখের পাতায়। দূরদৃষ্টি থেমে যায়। আমার চোখ দেখে আমাকে। নিথর শরীর দোলতে থাকে খোলা আকাশের নিচে।

আমার অবচেতন মনকে ভর করে আমি উপরে উঠছি। দেখছি, খোলা ছাদের এককোণে পাতা দোলনাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন শাহীদ দোলছে। যেনো এই শহরের সুখ তার খাদেম। সকল সুখেরা তার চোখে ভর করে আছে, জেগে আছে শিয়রে । রাতের নিরব আধারের বাতাস তার ঘুমন্ত শহরের ঘড়ির কাটা থামিয়ে দিয়েছে, ভুলাচ্ছে তার জগত।

আমি আরো উপরে উঠছি। দেখছি পুরো একটা শহর। উঁচুনিচু দালান , রাজপথে যানজট, আলোর কোলাহল, যান্ত্রিক মানব । তারার মত জেগে আছে শহরের আলো ; যেনো শহরজুড়ে একটুখানি লোডশেডিং এর আবদার। ইটের পাহাড়ে আলোকিত জানালার ভেতরের চিড়িয়া নির্ঘুম। সাদাকালো চোখে মিথ্যের রঙ। গলা থেমে গেছে আজ প্রযুক্তির আশীর্বাদে ; হলুদ রঙা মুখোশ সাজাচ্ছে মিথ্যে অনুভূতি, কিবোর্ডে জন্ম নিচ্ছে নাগরিক হাসি। মনে জমানো আছে আগুনের খনি, আবেগ পোড়াচ্ছে। উন্মাদী ভালবাসা হারিয়ে যাচ্ছে । এই শহরে প্রেম আছে, ভালবাসা নেই । হ্যাঁ প্রেম! শরীরকেন্দ্রিক প্রেম। ইভান ভাইয়ের গানের কথায়, "নেশা লাগে ঠোটে, নিশানা চোখে" ।

আমি আরো উপরে উঠতে উঠতে একদম পৃথিবীর বাইরে চলে এসেছি। আমি মহাশূন্য থেকে পৃথিবী দেখছি। দেখছি নাগরিক মানুষের যান্ত্রিক সংসার। সূর্য উঠে সূর্য ডুবে, ঘড়ির কাটা ১২-৬-১২ খেলা করে, আলো আঁধারের রঙ জ্বলে নিভে। এই পৃথিবীতে আবেগের চেয়ে অর্থের দাম বেশী ; ভালবাসার চেয়ে বিলাসিতার দাম বেশী।

আমি এতো উঁচু থেকেও স্পষ্ট শুনতে পারছি পৃথিবীর আর্তনাদ। চিৎকার করে আমি পৃথিবীকে বলছি , " পৃথিবী, কেমন আছো ? কেমন আছে তোমার মানব চিড়িয়ারা? "

অপ্রেমিক হয়ে উঠা

বয়স যখন অনুর্ধ আঠারো
তখন আমার প্রেম ছিল না,
তবু আমি প্রেমিক ছিলাম।
এখন আর প্রেমিক হতে পারি না।

কৈশোরে চোখের যে লজ্জা ভয় হয়ে যেতো,
তারুণ্যে সেই লজ্জা বানাতো দুঃসাহসী।
কৈশোর তারুণ্যে ছিল প্রেমিকের চোখ,
যৌবনে মৃত আবেগ, প্রেমিকা সর্বনাশী।

প্রেমিক থেকে অপ্রেমিক হওয়া মানুষের,
বাহ্যিক কান্না আসে না। 
ভালোবাসতে ভুলে যাওয়া মানুষ,
নিজেকে খুঁজে পায় না।

উপহার

 মানুষ মানুষকে কবিতার বই উপহার দেয়, গল্প-উপন্যাসের বই উপহার দেয়। কিন্তু কেউ কবিতা বা গল্প-উপন্যাস উপহার দেয় না। কারণ কবিতা, গল্প, উপন্যাস এইসবের বাহ্যিক কোনো গঠন নেই। সকল উপহার মানুষ বস্তুগত রূপে দিতে চায়। অথচ আমাদের জীবনে অন্যদের থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় উপহারগুলোরই কোনো বাহ্যিক রূপ নেই। যেমন, মায়ের কোলে তার শিশুর প্রতি ভালোবাসা, শৈশবের বন্ধুত্ব, স্কুল টিচারের ধমক কিংবা বেতের বারি, প্রেমিকার সাথে কাটানো মুহুর্ত, ভালোবাসা নিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার দুই জোড়া চোখের কথোপকথোনও উপহার; খুব সুন্দর উপহার। কারণ আমরা সময়ের পরে এইসবই মনে রাখি। অথচ উপহার হিসেবে শুধু বস্তুগত বিষয়ই খুঁজি। একটি পছন্দের গানও হতে পারে একটি উপহার। যেমন উপহার দিয়েছিলো আমার প্রাক্তন প্রেমিকা আমাকে। সেই গান যেনো তার নামে রেজিস্ট্রি করে রাখা আছে। এবং এই উপহার হারানোর সকল সম্ভবনা হারিয়ে গেছে। সেই গান শুনবো আর তার কথা আমার মনে পড়বে না; এমন কখনো হতে পারে না। এর চেয়ে সুন্দর উপহার আর কি-বা হতে পারে!

তাত্ত্বিক প্রেমিক

আমার একজন তাত্ত্বিক প্রেমিকা প্রয়োজন।
যে প্রেম নয়, প্রেমতত্ত্ব নিয়ে আসবে।
যার সাথে কথা হবে কবিতায় কিংবা চোখে
চুমু হবে কথাদের ঘর্ষণে, যুক্তির ওলট-পালটে
মন চাইলে কাছে আসবে দিনে একশোবার
কিংবা দূরে থাকবে একশো বছর,
তারপর হঠাৎ একদিন মন চাইলেই,
হুট করে এসে বলবে "ভালবাসি"
এ নিয়ে কারো কোনো অভিমান থাকবে না। 

আত্ন-অপ্রকাশ

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রজাপতি যদি জানতো,
সে বিশ্বের সমগ্র সৌন্দর্যকে ধারণ করে।
তাহলে নিজেকে লুকিয়ে রাখার অপরাধে,
অন্ধকারে বিসর্জন দিতো উড়ে বেড়ানোর আনন্দকে।
অথচ সে নিজের সৌন্দর্যকে জানে না বলেই,
সৌন্দর্যের লোভে ঘুরেফিরে অসুন্দরেও আনন্দে হাসে।

পৃথিবীর প্রতিটা মুহুর্ত নতুন করে জন্ম নেয়।
পৃথিবীর প্রতিটা হাসি নতুন করে জন্ম নেয়।
পৃথিবীর প্রতিটা প্রেম নতুন করে জন্ম নেয়।
নতুন করে জন্মায় না শুধু মানুষ, তবু
নতুন করে জন্ম নেয় মানুষের সবকিছু;
নতুন করে জন্ম নেয়, তোমার আমার--
ঠোঁটের কোণের হাসি, চোখের মিথ্যে পানি,
আমাদের যত ভুল ভালোবাসাবাসি,
প্রেমের মুখোশ পরে অপ্রেমের অনুভূতি।
গভীর অন্ধকারে পৃথিবীর চুম্বনে বুঝেছি,
নিজেরাই তো নিজেদের খুনী।

আমি বলি এইসব ভুলে চলো, একটুখানি বাঁচি
যেমন করে বেঁচে থাকে,
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রজাপতি।
যেমন করে বেঁচে থাকে,
সদ্য জন্মানো ছোট্ট শিশুটি। 

আমাদের চোখ

 পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ আছে, ঠিক তার দিগুণ আছে মানুষের চোখ। আর তাই আমরা দৃশ্যের ভিতর দেখি মিথ্যের ছায়া, আর মানুষের ভিতর রোবট। পৃথিবীর ইতিহাসে আজীবন দৃশ্যমান বিষ্ময়কর হয়ে থাকবে এই মানুষের চোখ। কখনো আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠে আমাদের চোখ, কখনও কালো মেঘ। কখনওবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো চলতে থাকে জীবনের অনিশ্চিত সব হিসেব, কিংবা যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত শহরের মতো হতাশার ক্লান্তি নিয়ে থমকে যায় আমাদের চোখ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিরিয়াল কিলারের চোখেও ভেসে উঠে প্রেমের চিহ্ন। কিংবা নিজের মাকে হত্যা করার পূর্ব মুহূর্তে যে চোখ ছিলো আগুনের মতো উত্তাপ, রক্তের মতো লাল; মাকে হত্যার করার পর সে চোখে নামে বৃষ্টি, নির্মল গ্রামের শেষ রাতের বৃষ্টি। কিংবা পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতু প্রেমিকা, "লোকে জানবে" এই ভয়ে যার প্রেমটি এখনো হয়ে উঠেনি, যার চোখ সদ্য ফুটে উঠা ফুলের মতো লাজুক; সেই চোখও হয়ে যেতে পারে মরুভূমির মতো শুষ্ক।

আমাদের দৃশ্যমান চোখেরই যখন এতো রূপ। তখন, যে চোখ অদৃশ্য কিংবা যে চোখে ভর করে একজন অন্ধ মানুষ হেঁটে চলে; সেই চোখের না জানি কতরূপ! সেই চোখ যদি দেখা যেতো, তাহলে হয়তো আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম। মুগ্ধ হয়ে ভালোবেসে যেতাম একে অপরকে। কিংবা, আজীবন দূরে থাকতাম একে অপর থেকে। ভাগ্যিস আমাদের চোখ কারো অদৃশ্য চোখকে দেখতে পারে না।

বোবা প্রেমিক

তুমি উত্তাল চলমান নীরব স্রোতের এক চিরযৌবনা বহমান নদী। যে নদীতে সমুদ্রজয়ী প্রেম বিজয়ী নাবিকের নিষেধাজ্ঞা জারী। আমি তাই গাঙচিল হয়ে উড়ে যাই তোমার বক্ষরেখা বেয়ে। হঠাৎ দেখলাম একটা মাছরাঙা এসে তোমার শরীর ছুঁয়ে নিয়ে গেলো একটি প্রাণ, আমি কিচ্ছু বলিনি। এরপর দেখলাম, একগুচ্ছ কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে তোমার শরীর ছুঁয়ে, আমি কিচ্ছু বলিনি। তারপর দেখলাম, একটি কিশোরের দল লাফাচ্ছে তোমার শরীরে, আমি কিচ্ছু বলিনি। শেষমেশ যখন আমি উড়তে উড়তে ক্লান্ত ভীষণ, তখন দেখলাম তোমার সত্ত্বা মিশে যাচ্ছে সমুদ্রে। আমি কিচ্ছু বলিনি। শুধু তোমার থেকে চোখ সরিয়ে দেখি, আমি তোমার বক্ষ বেয়ে আসলেও আমার ছায়া ছিল শুষ্ক মাঠের কিনারা ঘেষে। আমি হতাশ হইনি। শুধু, শুধু সাগরের মাঝে তোমারে খুঁজতে গিয়ে– আমি তোমারে পাইনি।

পরিচয় বদল

ধরো, ত্রিশ বৎসর পর হঠাৎ একদিন
'পৃথিবীটা গোল' থিওরিতে আমাদের আবার দেখা হয়ে গেলো,
ততদিনে আমাদের বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
আমার হাতের স্পর্শে তোমার যে শরীর এখন চঞ্চল হয়ে উঠে
তখন সে শরীর থুবড়ে যাবে বয়সের স্পর্শে। 
আমার ঠোঁটের স্পর্শে তোমার যে ঠোঁট আরো রক্তিম হয়ে যায়
তখন সে ঠোঁট রক্তজবার মতো লাল হবে সবুজ পানপাতায়।
এইযে এখন তুমি আমার যে হাতটি শক্ত করে ধরে আছো
ততদিনে এই হাত শক্ত করে ধরতে শিখে যাবে বুড়োদের লাঠি।
আজকাল যে ঘন কালো চুলে তুমি হাত বুলিয়ে দাও
ততদিনে এই চুল বকের ডানার মত সাদা হয়ে যাবে।

তখন আমায় চিনতে পারবে?
তোমার আজকের এই প্রেমিককে?
চিনতে পারবে আমার এই চোখ?
যেখানে তুমি তোমার সমুদ্দুর খুঁজে পাও
নাকি, ততদিনে আমাদের চোখে বসবাস করা
মোটা গ্লাসের চশমার অজুহাত দিবে?
সেদিন তোমার মনে পড়বে? আমাদের শেষ চুমুর কথা?
মনে পড়বে? শেষ কবে আমার জন্য কেঁদেছিলে?
নাকি ভুলে যাবে কি আমার নাম? কে আমি ছিলাম?

আমি একদিন প্রেমিক হবো

আমি একদিন প্রেমিক হবো,
পুরোনো ক্যাসেটের মতো আবেগ নিয়ে ভালোবেসে যাবো।
আমি একদিন প্রেমিক হবো,
এই লণ্ডভণ্ড শরীরে এলোমেলো চুল নিয়েই।
আমি একদিন প্রেমিক হবো,
পৃথিবীর সব বিষাদ মুছে দিয়ে তোমায় চুমু খাবো।

আমি একদিন ঠিক প্রেমিক হয়ে যাবো,
যেভাবে মাগরীবের আজানের সময় ঘরে ফিরে শৈশব।
যেভাবে শীতের ভোরে ঘাসেরা করে স্নান।
যেভাবে মানুষের হৃদপিণ্ড হুট করে থেমে যায়।
যেভাবে কেঁদে উঠে সদ্য জন্মানো শিশুটি।

অপ্রেমিকের কবিতা

আমি একটি কবিতা লিখতে চাইলাম, 
তারপর দেখতে দেখতে একটি বছর কেটে গেল। 
আমি ঘোরের মাঝে একটি লাইন-ই আওড়াতে থাকলাম,
"তুমি আমায় ভালোবেসেছিলে- কোনো এক চাঁদহীন রাতে"। 
তারপর আমার ক্লান্ত মগজ বিশ্রাম নেয়,
ভরা আমাবস্যার নক্ষত্রদের দিকে তাকিয়ে
কোনো সবুজ ঘাসের মাঠে, শীতল বাতাসে।
আমার অপ্রেমিক হৃদয় নেশায় বোধ হয়ে থাকে
ভরা পূর্ণিমায় নদীর বুকে, যেনো তার
একহাতে হুইস্কির বোতল, অন্যহাতে প্রেমিকার শেষ চিঠি।
তারপর ক্যালেন্ডারের পর ক্যালেন্ডার বদলায়,
আমার আর প্রেমিক হয়ে উঠা হয় না,
আমার আর কবিতা লেখা হলো না।

আমার কবিতা সেই একটি লাইনেই আটকে রইল,
তারপর কেটে গেলো আরো একুশটি বছর।

নববধুর জবানবন্দি

একদিন আমি নদীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?
নদী বললো,
আমাকে ছাঁয়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা
সারিসারি গাছগুলোকে ভালোবেসেছিলাম,
কিন্তু আমার ভাগ্য আমাকে প্রবাহিত করেছে প্রতিনিয়ত।
এখন আমি আকাশ ভালোবাসি,
ইচ্ছে হলেও তার সীমানার বাইরে যেতে পারি না।

একদিন আমি বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?
বৃষ্টি বললো,
যখন আমি মেঘ ছিলাম,
আমার সাথী হয়ে উড়ে চলা মেঘকে ভালোবেসেছিলাম
কিন্তু আমার ভাগ্য আমাকে ঝরিয়ে দিয়েছে।
এখন আমি পাতাল ভালোবাসি,
আমার বসবাস এখন এখানেই স্থায়ী।

একদিন আমি গাছকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?
গাছ বললো,
ক্লান্ত দেহ নিয়ে ডানা ঝাপটে
যে পাখি বাসা করেছিল আমার ডালে
তারে আমি ভালোবেসেছিলাম।
বৈশাখের কোনো এক শেষ রাত্তিরে
সে ডাল ভেঙে গেছে উত্তর অনিলে।
এখন আমি জমিন ভালোবাসি,
যেখানে আমার অস্তিত্ব স্থায়ী।

Monday, March 28, 2022

আমাদের প্রতিবিম্ব

আমি শেষরাতে একটা কবিতা লিখে
পরদিন সন্ধ্যায় তোমার হাতে দিলাম,
তুমি অস্ফুটে স্বরে বললে উঠলে,
ওমা! কবিতা কোথায়? এতো দুঃখ।

তুমি আসবে বলে সেদিন বিকেলে,
একমুঠো ঘাসফুল ছিড়ে, চুড়ি বানালাম।
ভালোবেসে পরিয়ে দিলাম তোমার হাতে।
তুমি বিস্মিত হাসিতে ছুঁয়ে দেখলে, আর বললে,
তুমি না ঘাসফুল খুব ভালোবাসো? তাহলে ছিড়লে কেনো?
 
আমি তোমার উনিশতম জন্মদিনে দিয়েছিলাম,
একজোড়া কবুতরের আজন্ম মুক্তি।
তুমি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে বললে,
ওমা! আমাকে দিলে কোথায়? সেতো উড়িয়েছো।

এ শহর বড্ড মিথ্যেবাদী

আমার হৃদয় বলছে তুমি আছো,
আমার শরীরে তোমার ছুঁয়ে যাওয়া স্পর্শ বলছে তুমি আছো।
আমার অবচেতন মন বলছে তুমি আছো।
আমার স্বপ্ন বলছে তুমি আছো।
অথচ এই শহর বলছে তুমি নেই।

প্রিয়তমা, তুমি ফিরে আসো,
ফিরে আসো হৃদয়ের খুব কাছে।
চোখে চোখ রেখে বলে যাও,
এ শহর বড্ড মিথ্যেবাদী।

সিগারেট বনাম প্রেম

প্রিয়তমা,
তুমি আমায় বারণ করেছিলে সিগারেট ফুকতে
এতে নাকি ফুসফুস পুঁড়ে যায়?
এখন আমি সিগারেট ফুকি না।
অথচ দেখো, এখন আমার হৃদয় পুঁড়ে যাচ্ছে
কারণ তুমিই বলেছিলে আজীবন ভালবাসতে।

হৃদয়ের বসতবাড়ি

শরীরতত্ত্বের ডাক্তারেরা কি বলতে পারবে?
হৃদয়ের বসতবাড়ি কোথায়?
শরীর থেকে কতদূর?
আত্নার সাথে তার কি অমিল?
হৃদপিণ্ডের খুব কাছে?
ডাক্তারেরা বলবে, মগজের হাইপোথ্যালামাসে।
বিশ্বাস করো প্রিয়তমা, ওসব ভুল কথা
আমার তো বুকের ঠিক ঐখানটাই ব্যথা,
যেইখানে তুমি কান পেতে শুনতে চাইতে, "ভালবাসি কিনা!"

জীবন বনাম হৃদয়

প্রিয়তমা,
জীবন আর হৃদয়ের মাঝে পার্থক্য বোঝো?
জীবন হচ্ছে একটি সমুদ্র;
সমুদ্রে আছে অজস্র প্রাণ,
সমুদ্র হচ্ছে সবিস্তর গভীর।
আর হৃদয়?
হৃদয় হচ্ছে সেই সমুদ্রের নীল পানি!
প্রিয়তমা তুমি কি জানো,
সমুদ্র থেকে পানি শুকিয়ে গেলে কি হবে?
আমি বলছি,
প্রেমিকা শব্দের আগে প্রাক্তন বসালে যা হয়। 

প্রাক্তন

মেলাদিন পরে আবার আমার মনে পড়লো,

আমি তোমারে ভালবাসতাম!

মেলাদিন পরে আবার আমার মনে পড়লো,

তোমারে কাছে ডাকতাম, পাশে চাইতাম।

তোমার গলার একটা গান শোনার লাইগা

মাঝরাইতে কেমনে হাসাইতাম।

তুমি কি এখন মাঝরাইতে গান গাও না?

রাইতের খাবারের কথা ভুইলা যাও না?

বিকাল সন্ধ্যায় বাসা থাইকা বাইর হইলে,

তোমার বাসার সামনের গলির মোড়ে

আমারে খুঁজো না?

নাকি তোমার মতোন,

তোমার বাসাটারেও বদলাইয়া ফালাইছো!


মেলাদিন পরে এখনও আমার মাঝেমধ্যে অসুখ হয়

জ্বর মাপার উছিলায় এখন কি আর তোমার

আমার কপাল ছুঁইতে ইচ্ছা করে না?

বেলপুরির বাহানায় গলির মোড় ঘুড়াইয়া

এখন কি আর রাস্তা বাড়াইতে মন চায়না?

"আমি শুনেছি সেদিন তুমি" গানটা হুনলে,

আমার কথা মনে পড়ে না?

নাকি গানটাই আর হুনো না, গাও না?

দ্যাহো আমিও কেমন বদলাইয়া গেছি,

“বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি”-তে তোমারে চাইনা।

অথচ দ্যাহো,

তোমার রবীন্দ্রনাথ বদলায় নাই

আমার জীবনানন্দ দাশও বদলায় নাই

তোমার নীল আসমান বদলায় নাই

আমার রাইতের আন্ধারও বদলায় নাই

তোমার মতোন,

তোমার ভেজা চুলের গন্ধটাও কি বদলায়া গ্যাছে?


মেলাদিন পরে এখনও আমার কাছে,

"প্রেমিকা" শব্দটার চেয়ে তোমার নামটা প্রিয়।

তোমার দেওয়া আমার ডাকনামটা কি ভুইলা গেছো?

নাকি অন্য কাউরে দিয়া দিছো?

আচ্ছা, মানুষ বদলায়া ভালোবাসান যায়?

ভালো যদি বারবার বহুজনরে বাসা যায়

তাইলে আমরা তারে ভালোবাসা বলি ক্যান?

আমি জানি ভালোবাসা হইলো তোমার মতন,

যার কোন বিকল্প নাই, অন্যত্র নাই।


আচ্ছা, তুমি এহন যেই শহরে থাহো,

সেই শহরে কেউ বকুল কুড়ায়া আনে?

তুমি এহন যেই রাত্তিরে জাগো,

সেই রাত্তিরে কেউ গান শোনার আবদার করে?

আজকাল যখন ঘুমায়া থাকো,

তোমার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ শোনার লাইগা ফোন আসে?

বিকালের আসমানে মেঘ করলে,

বৃষ্টির প্রার্থনা নিয়া কেউ রাস্তায় দাড়ায়া থাকে?


অথচ আমি জানি,

আমি তোমারে ভালবাসি না

এম্নে কি ভালোবাসান যায়?

অবশিষ্ট প্রেম

আমার এক চোখ ফেটে রক্ত ঝরছে,
অন্য চোখ শীতল- প্রেমিকা হাসে।
আমার এক কান উত্তপ্ত হয়ে আছে যন্ত্রণায়,
অন্য কানে প্রেমিকার কণ্ঠ 'ভালবাসি ভালবাসি'।
আমার এক নাসারন্ধ্রে জ্বরের উত্তাপ,
অন্য নাসারন্ধ্রে প্রেমিকার ঘন শ্বাস।
আমার মুখগহ্বর মরুভূমির মতো তৃষ্ণার্ত,
ঠোঁটে লেগে আছে প্রেমিকার ঠোঁটজোড়া।
আমার বুকের ডানপাশে ফুসফুস ভরে গেছে নিকোটিনে,
অন্যপাশে প্রাণ জেগে আছে প্রেমিকার ভালবাসায়।
আমার শরীর শুকিয়ে গেছে প্রেমহীনতায়,
আমার মন বেঁচে আছে প্রাক্তনের ভালবাসায়।

অপ্রেমিকের আত্নপ্রকাশ

আমি সেই প্রেমিক,
যাকে আশির্বাদ করেছিলো পৃথিবীর কাল বিজয়ী বিচ্ছেদেরা।
আমি সেই প্রেমিক,
যাকে নতজানু হয়ে সম্মান করেছিলো পৃথিবীর সমগ্র বিরহ।
আমি সেই প্রেমিক,
যাকে দেখা মাত্র সুখের কসাই গেয়ে উঠতো আনন্দের গান।

আমি সেই মহাপুরুষ,
যে পাজরের ভেতর হৃদয় নয়, হৃদপিণ্ড বহন করে।
আমি সেই মহাপুরুষ,
যে রক্তে-মাংসে গড়ে উঠে, নিজের কঙ্কালে ভর করে চলে।
আমি সেই মহাপুরুষ,
যে মগজে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে, মৃত্যুর দিকে ছুটে চলে।

আমি সেই হৃদয়বান,
যার জন্য কান্না করতে শিখেছে পাহাড়, নাম দিয়েছি তার ঝর্ণা।
আমি সেই হৃদয়বান,
যার শরীরে চামড়ার চেয়েও কাছে মিশে আছে - আত্নঘৃণা।
আমি সেই হৃদয়বান,
যার জন্য মায়ের বুকের ভেতর বয়ে চলে নরকের সুখ।

কর্পোরেট প্রেমের জন্ম

আমি একটি বোমার গাছ লাগিয়েছিলাম,
যত্ন করে প্রতি সন্ধ্যায় মদ ডালতাম গাছের গোড়ায়।
সিগারেটের ছাইকে ছিটিতে দিতাম প্রতিটি শাখা-প্রশাখায়।
হাজার বছর চাষাবাদের পর গাছে একটু ফুল ফুটলো,
পৃথিবীর শেষ প্রেমিক এসে ফুলটি ছিড়ে নিয়ে
তার প্রেমিকাকে উপহার দিয়ে বললো, "ভালোবাসি"।
পৃথিবীর শেষ প্রেমিকা ফুলের নাম দিলো 'গোলাপ'।
তারপর ফুলটি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে গেলো পৃথিবীর প্রেম।
এরপর থেকে আমরা প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য,
সকলেই হয়ে গেছি কর্পোরেট প্রেমিক-প্রেমিকা।

মানুষ এবং মানুষ

কখনো নিজের দিকে তাকানোর সাহস হয় নি বলে,
আজীবন তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে- কিংবা,
যারা তাকিয়ে থাকে নিজেদের দিকে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি জানতে পেরেছি,
মূলত আকাশ বলে কিচ্ছু নেই।
যতদূর চোখ যায়, ঠিক তার ঠিকানায়
যে নীল রঙ দৃশ্য আঁকে, তা শুধু অন্ধদের প্রাচীর।

যেসকল মানুষ নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকে,
তাদের থেকে আমি শিখেছি,
অন্যদের থেকে শেখার কিছু নেই।
জীবন হলো তথাকথিত আকাশের চেয়েও বিশাল,
এখানেও মেঘেদের মতো খেলা করে ঝাপসানো স্বপ্ন।

এরপর যখন আমি,
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে নিজের দিকে তাকালাম-
নিঃসঙ্গ চাঁদের মতো উলঙ্গ এক শরীর দেখতে পেলাম।
যার কপালে খুদাই করে লেখা আছে "আত্নঘৃণা"।

তারপর আমি ভালোবাসার উদ্দেশ্যে,
মানুষের ভীড়ে ডুকলাম, দেখতে পেলাম-
মরিচিকার পোশাক পরে তাকিয়ে আছে আকাশে।
চোখ ঝলসে গেছে সূর্যের উত্তাপে। তবু,
"ভালোবাসা পাইনি বলে, ভালোবাসা দেইনি" সমীকরণে,
একে অপরকে চোখে চশমা দিয়ে দেখছে।
শরীর থেকে শরীরের দূরত্ব ক্রমাগত কমছে,
হৃদয় থেকে হৃদয়ের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়ছে।

এতো সভ্য জনতার ভীড়ে আমি এক উলঙ্গ নিঃসঙ্গ মানব।
যার চোখ এখনো নির্মল আর্দ্র, চশমাতে অনভ্যস্ত।
যে চায় সহশ্র মানুষের ভীড়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে।
যে চায় ভালোবেসে হৃদয় থেকে হৃদয়ের দূরত্ব কমিয়ে নিতে।

অন্ধের অন্ধকার

বিষাদ দিনযাপনের ইতিহাস থাকুক শহর জুড়ে। ঘর থেকে বের হলেই যেন দেখতে পাই, নষ্ট হওয়া খাবারের গন্ধে কতটা উন্মাদ দাঁড় কাক। ঘৃণাভরা কোলাহল ভাঙলেই য...